গর্ভাবস্থায় অন্যান্য উপসর্গ (Other Common Symptoms in Pregnancy) বলতে মূলত সেই সমস্ত শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলোকে বোঝায়, যা একজন হবু মায়ের পুরো নয় মাসের জার্নিতে কম-বেশি দেখা দিয়ে থাকে। হরমোনের ওঠানামা এবং গর্ভস্থ শিশুর ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে জরায়ুর চাপ বাড়ার কারণে শরীরে নানাবিধ অস্বস্তি তৈরি হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো—তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক ও বুক জ্বালাপোড়া, কোমর ও পিঠের ব্যথা, পায়ে টান লাগা বা পানি আসা, ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন (Mood Swings) এবং অনিদ্রা। এই সমস্যাগুলো যদিও গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক অংশ, তবুও এগুলো দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে বেশ কষ্টদায়ক করে তোলে।এই সমস্ত সাধারণ অথচ বিরক্তিকর উপসর্গগুলোর উপশমে হোমিওপ্যাথি একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও আশীর্বাদস্বরূপ চিকিৎসা পদ্ধতি।এটি শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, হজম প্রক্রিয়া সচল রাখতে এবং মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে চমৎকার কাজ করে, যা একটি সুস্থ প্রসবের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
গর্ভাবস্থার বিভিন্ন সাধারণ উপসর্গ ও লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ব্যবহৃত কিছু নিরাপদ ঔষধ:
| উপসর্গ বা লক্ষণ | সম্ভাব্য হোমিওপ্যাথিক ঔষধ | ব্যবহারের ক্ষেত্র |
| কোষ্ঠকাঠিন্য (Constipation) | Alumina / Bryonia Alba | মল অত্যন্ত শক্ত, শুষ্ক হলে এবং কয়েকদিন পর পর মলত্যাগের বেগ হলে। |
| বুক জ্বালাপোড়া ও এসিডিটি | Robinia / Carbo Veg | খাবার খাওয়ার পর মুখে টক পানি উঠলে এবং পেট প্রচণ্ড ফেঁপে থাকলে। |
| কোমর ও পিঠের ব্যথা | Kali Carb | গর্ভাবস্থার শেষ দিকে কোমরে তীব্র ব্যথা হলে, যা মনে হয় ভেঙে যাবে। |
| অনিদ্রা ও মানসিক অস্থিরতা | Coffea Cruda / Coffea Tosta | অতিরিক্ত চিন্তার কারণে রাতে ঘুম না আসলে এবং মন শান্ত না হলে। |
| পায়ে টান লাগা বা ক্র্যাম্প | Magnesia Phos | রাতে ঘুমানোর সময় পায়ের পেশিতে হঠাৎ তীব্র টান বা খিঁচুনি ধরলে। |
| পা ফুলে যাওয়া (Edema) | Apis Mellifica | যদি পায়ে পানি আসে, ফোলা ভাব থাকে এবং জুতো পরতে কষ্ট হয়। |
যেমন (১) কোষ্ঠকাঠিন্য লক্ষণে এলুমিনা, ব্রায়ো, নাক্স, প্লাম্বাম, ইপিয়া ৩০ শক্তি দিনে ৩/৪ বার। অথবা ক্যাসকারা সাগাড়া Q ২/৩ ফোঁটা মাত্রায় গরম জলের সাথে দিনে ২/১ বার। (২) উদরাময়ে এন্টিম কুড, ফসফরাস, সিপিয়া (সালফার) যে কোন একটি ৩০ চার ঘন্টাত্তর (৩) পায়ের ডিমে খিল ধরলে সিপিয়া বা কুপ্রাম ৩০। পায়ে খিল ধরলে কাছে কার্ব। হাতে পায়ে খিল ধরলে কুপ্রাম মেট, ভিরেট্রাম ৩০ তিন/চার ঘন্টান্তর । (৪) বুক ধরফর করলে লিলিয়ামটিগ ৩০ চার ঘন্টাত্তর অথবা কেলিফস ও ম্যাগফস ৬x চারটি করে বড়ি পর্যায়ক্রমে ৩ ঘন্টাত্তর। (৫) অর্শ দেখা দিলে ও তা থেকে রক্তস্রাব হলে কলিনসোনিয়া ৬. দিনে ৪/৫ বার। (৬) মাথা ঘুরালে জেলস, ককুলাস, নেট্রাম মিউর ৩০ শক্তিতে দিনে ২/৩ বার । ইহাতে মেডোরিনাম হাজার বা তদোর্থ শক্তি সুন্দর কাজ করে । (৭) মুখে ক্ষত ইউপেটো এরোমেটিকাম ৬x দিনে ২ বার খাবে। (৮) দাঁত বেদনায় বেল, ম্যাগ কার্ব, সিপিয়া, ৩০ শক্তিতে তিন ঘন্টাস্তর। ইহাতে র্যাটানহিয়া ৩০ তিন ঘন্টাত্তর ভাল কাজ করে । (৯) গর্ভাবস্থায় স্ত নের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে পালসেটিলা ২০০। (১০) আক্ষেপে বেল, ক্যামো, সিকিউটা, হায়োসি, ইগ্লেসিয়া, ভিরেট্রাম- যে কোন একটি ৩০, দিনে ৩/৪ বার সেব্য । (১১) মাথা ব্যথায় বেল, ব্রায়ো, ককুলাস, নাক্স, প্লাটিনাম, পালস, ভিরেট্রাম, গ্লোনইন ৩০ তিন ঘন্টাত্তর সেব্য। (১২) গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে এলবুমিন লক্ষণে হেলোনিয়াস ৬ (মার্ককর) দিনে ৩/৪ বার। (১৩) জন্ডিস লক্ষণে অরাম মেট ২০০, ৪/৫ দিন পর পর অথবা চেলিডোনিয়াম ৫ ফোটা মাত্রায় দিনে ৩ বার। (১৪) গর্ভাবস্থায় সিসটাইটিসে ইউপেটোপাপিউ ৩০, দিনে ৩ বার সেব্য। ইহাতে স্ট্যাফিসেগ্রিয়া বা ক্যান্থারিস ৩০ চার ঘন্টাগুর ব্যবহার করা যায় । (১৫) গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হলে পালসেটিলা ৩০ (ককুলাস, এসিড ফস) দিনে ২ বার। * গর্ভাবস্থায় ও প্রসবের পর (আর্স) প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে ইকুইজিটাম ৩০ চার ঘন্টাগুর (১৬) বুক জ্বালা, টক ঢেকুর উঠা, টকরমি লক্ষণে ম্যাগকার্ব ৩০ শক্তি দিনে ৪ বার। (১৭) ডিম্বকোষে বেদনায় কেলিফস ৬x বা জ্যান্থজাইলাম ২০০ দিনে ১ বার (৪/৫) ডোজ । (১৮) গর্ভাবস্থায় ভেরিকোজ ভিন রোগে কার্বোভেজ, লাইকো পালস, ফেরাম-২০০ শক্তিতে ২/১ দিন পর পর ১ মাত্রা। (১৯) গর্ভাবস্থায় খুব ক্ষুধার্ত হলে (Voracious appetite ) ম্যাগমিউর, নাক্স, পেট্রোলিয়াম, সিপিয়া-৩০ শক্তিতে দিনে ২/১ বার (৪/৫ দিন) ব্যবহার্য ।(২০) গর্ভাবস্থায় ঋতুস্রাবে (Menses) ককুলাস, কেলিকার্ব, নাক্স-ম, ফস, সিকেলিকর ২০০ শক্তিতে যে কোন ১টি দিন ১ বার। (২১) প্রস্রাব ঝরলে ক্রিয়োজোট, পালস, সিপিয়া, ককুলাস ২০০ শক্তিতে দিনে ২ বার। (২২) অনিদ্রায় কেলিফস ৬x, কফিয়া ৩০ অথবা ককুলাস ৩০ দিনে ২/১ বার। (২৩) গর্ভাবস্থায় দুর্বলতা) এভেনা স্যাটাইভা Q ১০ ফোঁটা গরমে দুধের সাথে দিনে ২ বার। সাথে বায়োকেমিক কেলিফস ৬x তিন বড়ি দিনে ২ বার খাবে। (২৪) হঠাৎ পা ঠান্ডা হয়ে গেলে কার্বোভেজ ৩০, ২০/২৫ মিঃ অন্তর। গর্ভাবস্থায় মুর্ছা গেলে বেল, আর্ণিকা, ইগ্লেসিয়া, কলোফাইলাম ৩০ তিন ঘন্টান্তর ।
পর্যাপ্ত পানি ও আঁশযুক্ত খাবার: কোষ্ঠকাঠিন্য ও এসিডিটি এড়াতে দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার পানি পান করুন এবং খাবারে প্রচুর শাকসবজি ও ইসবগুলের ভুষি রাখুন।
হালকা ব্যায়াম: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে বা বিকেলে ১৫-২০ মিনিট হালকা হাঁটাচলা করুন, এটি কোমর ব্যথা ও পায়ের টান লাগা কমাবে।
শোয়ার সঠিক নিয়ম: ঘুমানোর সময় বাম কাৎ হয়ে শোয়ার চেষ্টা করুন। এটি জরায়ুতে এবং গর্ভস্থ শিশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে।
সতর্কতা: গর্ভাবস্থায় যেকোনো ছোট সমস্যাও অবহেলা করা উচিত নয়। যেকোনো হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবনের আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
গর্ভাবস্থায় শরীরে প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পরিপাকতন্ত্রের পেশিগুলো শিথিল হয়ে যায় এবং হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়। এছাড়া জরায়ুর আকার বড় হওয়ায় তা অন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর সমাধানে প্রচুর পানি পান করা, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শে Bryonia বা Alumina সেবন করা যেতে পারে।
হরমোনের প্রভাবে পাকস্থলীর ভাল্ব শিথিল হয়ে যাওয়ায় অ্যাসিড সহজেই ওপরের দিকে বা খাদ্যনালীতে উঠে আসে, যাকে 'অ্যাসিড রিফ্লাক্স' বলে। এটি কমাতে একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া উচিত। খাওয়ার ঠিক পরপরই শুয়ে না পড়ে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা ভালো। হোমিওপ্যাথিতে Robinia ঔষধটি বুক জ্বালাপোড়া কমাতে অত্যন্ত কার্যকর।
গর্ভাবস্থায় শরীরে অতিরিক্ত তরল তৈরি হয় এবং বড় হতে থাকা জরায়ুর চাপে পায়ে রক্ত সঞ্চালন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে পা হালকা ফুলতে পারে। তবে পা ফোলার সাথে যদি মুখ-চোখ ফুলে যায় এবং উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তবে তা 'প্রি-এক্লাম্পসিয়া'র লক্ষণ হতে পারে। সাধারণ ফোলা ভাব কমাতে পা কিছুটা উঁচুতে রাখা এবং Apis Mellifica ব্যবহার করা হয়।
মোট 12টি ওষুধ
এই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও রোগ সম্পর্কে জানুন
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত
যোগাযোগ করুন