গান গাওয়া বা অতিরিক্ত সুরচর্চা (Singing / Vocal Strain) একজন সংগীতশিল্পীর জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং নিয়মিত অভ্যাসের বিষয় হলেও, অনেক সময় এটি কণ্ঠনালীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চস্বরে গান গাওয়া, ভুল পদ্ধতিতে রেওয়াজ করা কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া টানা পারফর্ম করার ফলে ভোকাল কর্ড বা স্বরতন্ত্রীতে প্রচণ্ড টান পড়ে। এর ফলে গলার স্বর বসে যাওয়া, স্বরভঙ্গ (Hoarseness), গলায় ব্যথা, শুষ্কতা বা খসখসে ভাব এবং সুর বা স্কেল ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে 'ভোকাল স্ট্রেন' বা গায়কদের পরিভাষায় 'কণ্ঠের ক্লান্তি' বলা হয়। কখনো কখনো এই সমস্যা অবহেলা করলে ভোকাল কর্ডে ছোট ছোট নডিউল (Vocal Cord Nodules) বা পলিপ তৈরি হতে পারে, যা গায়কদের ক্যারিয়ারের জন্য একটি বড় হুমকি।গায়কদের এই কণ্ঠনালী বা গলার স্বর সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় হোমিয়োপ্যাথি একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ চিকিৎসাপদ্ধতি।
সংগীতশিল্পী বা গায়কদের গলার বিভিন্ন লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ব্যবহৃত প্রধান কিছু ঔষধ:
| ঔষধের নাম | ব্যবহারের লক্ষণ |
| Arnica Montana | দীর্ঘক্ষণ গান গাওয়া বা চিৎকার করার পর গলার পেশি যদি থেঁতলে যাওয়ার মতো ব্যথা হয় এবং কথা বলতে কষ্ট হয়। একে গায়কদের জন্য 'কণ্ঠের টনিক' বলা চলে। |
| Argentum Nitricum | উচ্চ নোটে গান গাওয়ার পর হঠাৎ গলা বসে যাওয়া, গলায় কাঠি ফোটার মতো অনুভূতি হওয়া এবং অতিরিক্ত শ্লেষ্মা বা কফ জমার কারণে বারবার গলা খাঁকারি দেওয়ার প্রবণতা। |
| Causticum | গায়কদের পুরনো স্বরভঙ্গ, যেখানে সকালে গলা বেশি বসা থাকে, ঠাণ্ডা বাতাসে সমস্যা বাড়ে এবং এক ঢোক ঠাণ্ডা পানি খেলে সাময়িক আরাম পাওয়া যায়। |
| Phosphorus | সন্ধ্যার দিকে গলা বসে যাওয়া, গলার ভেতর প্রচণ্ড শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া এবং কথা বলতে গেলে বা গান গাইতে গেলে কাশির উদ্রেক হওয়া। |
| Rhus Toxicodendron | গান গাওয়ার শুরুতে গলা খুব বসা বা খসখসে মনে হলেও, কিছুক্ষণ গাওয়ার পর (কণ্ঠ সচল হলে) স্বর কিছুটা পরিষ্কার হয়ে আসে। |
১। গান করার ৩ ঘন্টা পূর্ব থেকে কোকা ৩, ৫/ ফোঁটা মাত্রায় আধ ঘন্টাত্তর সেবনে স্বরভঙ্গ হয় না (ডঃ বরিক)। ২। কেহ কেহ বলেন গায়ক দিগকে গান গাহিবার কিছু পূর্বে মেছাপিপারেটা ৩, ৬ দু 'চার ফোঁটা মাত্রায় কয়েকবার সেবনে তারা বহুক্ষণ গান গাইতে পারেন। ** গান করে স্বরভঙ্গ হলে সেলিনিয়াম বা আর্জ নাই অথবা আর্নিকা ৩০, তিন ঘন্টাস্তর ব্যবহার্য। গান অসহ্য-বিউফো, এন্থ্রা, থুজা, গ্রাফাইটিস (কাঁদে) এবং নেট্রাম গ্রুপ |
ভোকাল রেস্ট (Vocal Rest): গলা ভেঙে গেলে বা ক্লান্তি বোধ হলে জোর করে গান গাওয়া বা উচ্চস্বরে কথা বলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুন। কণ্ঠনালীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন।
হালকা গরম পানি ব্যবহার: রেওয়াজের মাঝে বা গান গাওয়ার পর সামান্য কুসুম গরম পানি পান করুন। এটি ভোকাল কর্ডকে আর্দ্র (Hydrated) রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানি বা বরফ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
স্টিম ইনহেলেশন: গলার খসখসে ভাব কমাতে দিনে ১-২ বার গরম পানির ভাপ বা স্ট্রিম নিতে পারেন। এটি গলার ভেতরের শুষ্কতা দূর করে।
খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত ঝাল, টক, তৈলাক্ত খাবার এবং ক্যাফেইন (চা/কফি) এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো অ্যাসিডিটি বা রিফ্লাক্স তৈরি করে গলাকে আরও উত্তেজিত করতে পারে।
দীর্ঘক্ষণ একটানা গান গাওয়া, উচ্চ স্কেলে বা ভুল পদ্ধতিতে রেওয়াজ করা কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া কণ্ঠের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ভোকাল কর্ড বা স্বরতন্ত্রীতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে স্বরতন্ত্রীতে প্রদাহ বা ফোলা ভাব তৈরি হয়, যা গায়কদের গলা বসা বা স্বরভঙ্গের প্রধান কারণ।
সংগীতশিল্পীদের কণ্ঠনালীর সুরক্ষায় হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত চমৎকার ও স্থায়ী কাজ করে। প্রচলিত অনেক পেইনকিলার বা স্প্রে গলার আর্দ্রতা কমিয়ে কণ্ঠস্বরকে রুক্ষ করে দিতে পারে। কিন্তু হোমিওপ্যাথিক ঔষধ (যেমন—Arnica, Argentum Nitricum) কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ভোকাল কর্ডের চারপাশের পেশির ক্লান্তি দূর করে কণ্ঠকে স্বাভাবিক নমনীয়তা ও সুমিষ্ট ভাব ফিরিয়ে দেয়।
হ্যাঁ, দীর্ঘদিনের কণ্ঠের অবহেলা বা অতিরিক্ত টানের ফলে ভোকাল কর্ডে যে ছোট ছোট টিউমার বা নডিউল তৈরি হয়, সঠিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে তা প্রাকৃতিকভাবেই গলিয়ে ফেলা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে রোগীর সামগ্রিক লক্ষণ বিচার করে Thuja, Causticum বা Calcarea Flour-এর মতো গভীরক্রিয় ঔষধ ব্যবহার করা হয়, যা অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগীকে সুস্থ করে তোলে।
মোট 10টি ওষুধ
এই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও রোগ সম্পর্কে জানুন
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত
যোগাযোগ করুন