ক্ষত বা ইনজুরি (Wounds / Injury) হলো শরীরের বহিরাগত বা অভ্যন্তরীণ টিস্যুর এমন একটি অবস্থা, যেখানে ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হয়। এটি ধারালো কিছুর আঘাতে কেটে যাওয়া, পড়ে গিয়ে ছিলে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, থেঁতলে যাওয়া কিংবা অপারেশনের কারণে হতে পারে। একটি তাজা ক্ষত সাধারণত ব্যথাদায়ক হয় এবং সেখান থেকে রক্তপাত হতে পারে। শরীরের নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম সময়ের সাথে সাথে নতুন কোষ তৈরি করে ক্ষত স্থানটি শুকিয়ে তোলে। তবে ডায়াবেটিস, রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা বা পুষ্টির অভাব থাকলে অনেক সময় ক্ষত সহজে শুকাতে চায় না এবং সেখানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ (Infection) ঘটে পুঁজ বা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে।ক্ষত দ্রুত শুকাতে এবং যেকোনো ধরণের ইনফেকশন বা পচন (Sepsis) রোধ করতে হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।এটি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ক্ষত স্থানের পুঁজ বা ইনফেকশন দূর করে, রক্তপাত বন্ধ করে এবং ব্যথার তীব্রতা দ্রুত কমিয়ে আনে। বিশেষ করে পুরনো বা ডায়াবেটিক ক্ষত (Diabetic ulcer) নিরাময়ে হোমিওপ্যাথির সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
ক্ষতের ধরণ এবং লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ব্যবহারের কিছু প্রধান ঔষধ:
| ঔষধের নাম | ব্যবহারের লক্ষণ |
| Calendula Officinalis | এটি হোমিওপ্যাথির "প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক"। যেকোনো খোলা ক্ষত, ছিলে যাওয়া বা অপারেশনের ক্ষত দ্রুত শুকাতে এবং পুঁজ হওয়া আটকাতে এটি বাহ্যিক (Mother Tincture) ও অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহৃত হয়। |
| Arnica Montana | পড়ে গিয়ে বা ভোঁতা কিছুর আঘাতে চামড়া না কেটে যদি ভেতরটা থেঁতলে যায়, নীল হয়ে ফুলে ওঠে এবং তীব্র ব্যথা থাকে। |
| Hypericum Perforatum | যদি সুঁই, পেরেক বা ধারালো কিছু দিয়ে স্নায়ুসমৃদ্ধ স্থান (যেমন—আঙুলের ডগা বা মেরুদণ্ড) কেটে যায় এবং তীব্র শল্কবৎ বা শূলানি ব্যথা থাকে। |
| Ledum Palustre | ইঁদুর, বিড়াল বা কুকুরের কামড় এবং সুঁই বা পেরেকের মতো সূক্ষ্ম জিনিসের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত। আক্রান্ত স্থানটি স্পর্শ করলে ঠান্ডা কিন্তু গরমে ব্যথা বাড়ে। |
| Lachesis / Silicea | পুরনো ক্ষত যা সহজে শুকাচ্ছে না, অনবরত দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বা রক্ত বের হচ্ছে এবং ক্ষত স্থানটি কালচে বা বেগুনী রঙ ধারণ করেছে। |
| Staphysagria | ধারালো অস্ত্র বা ছুরির আঘাতে একদম সোজাসুজি কেটে যাওয়া এবং সিজারিয়ান বা যেকোনো সার্জারির পরের ক্ষত ও ব্যথা শুকাতে সেরা ঔষধ। |
১। ক্ষত স্থানে অত্যন্ত বেদনা থাকিলে, এসাফিটিডা ২০০. দিনে ১ বার লম্বা হাঁড়ে ক্ষত হইলে এঙ্গুষ্ঠেরা ২০০, তিন দিন অন্তর ১ মাত্রা। ৩। লম্বা হাড়ের ক্ষতের সহিত উদরাময় থাকিলে ট্রনসিয়াম কার্ব ২০০, ৪ দিন অন্তর ১ মাত্রা। ৪। হাড়ের উপরিভাগে তিবলি থাকিলে এবং উহাতে ক্ষত হইলে ক্যাল্কেরিয়া ফ্লোর ২০০, ২/৩ মাত্রা দিয়া পরে উচ্চ শক্তি ব্যবহার্য। ৫। নাকের হাড়ের ক্ষতে অরাম মেট ২০০, সপ্তাহে ১ বার। ৬। সিফিলিসের দোষ হইতে ক্ষত হইলে হিপার সালফ, মার্কসল, নাইট্রিক এসিড-যে কোন একটি ২০০ হইতেউচ্চশক্তি ব্যবহার্য ৭। পুঁজ নিঃসরণযুক্ত নালী ক্ষতে সাইলিসিয়া ২০০ থেকে। ৮। ক্ষত স্থানে মামড়ী পড়িলে ও অসহ্য চুলকানি থাকিলে মেজিরিয়াম ২০০ হইতে উচ্চশক্তি । ৯। মুখের ভিতর হইলে বোরাক্স, কেলিক্লোরিকাম ৩০. দিনে ২ বার। ১০। গলার ক্ষতে ফাইটোলাক্কা ৩০. দিনে ৩ বার । ১১। জিহ্বার ক্ষতে মার্চ, সল বা ক্রিয়োজোট ৩০. তিন ঘন্টাস্তর। ১২। শয্যা ক্ষতে আর্নিকা বা পাইরোজেন ২০০, ২/১ ডোজ। ১৩। পাকস্থলীর ক্ষতে ইউরেনিয়াম নাইট্রিকাম ৩০, দিনে ২ বার। ১৪। মাংসের উপর ক্ষতে কেলিৰাই ২০০ ে বার। উপদেশ-শরীরের উপরিভাগে ক্ষতে ইচিনেশিয়া বা হাইড্রাষ্টিস (Q) দ্বারা লোশন করিয়া ধৌত করা বিধেয়। ১৫ ক্ষতে জ্বালা-জ অধ্যায়ে দেখুন। ১৬। দুষিত ক্ষতে ষ্ট্যাফাইলোককসিন বা ষ্টেপটোকসিন ২০০ দিনে ২ বার (সকালে ও বিকালে) সেবনে ভাল ফল পাওয়া যায়। ১৭। ক্ষত চিহ্ন দূর করিতে থিয়োসিনামিন ২০০, দিনে ২ বার। ১৮। উৎকট ক্ষতে ভীষণ জ্বালা লক্ষণে (ঠান্ডায় উপশম) এনথ্রাক্সিনাম ২০০, চার ঘন্টাত্তর। ১৯। নাসিকার মধ্যে পচনশীল ক্ষতে অরাম মেট বা ক্যাডমিয়াম সালফ ২০০, দিনে ১ বার। ২০। নাক, মুখ ইত্যাদির উপর লুপাস জাতীয় ক্ষত লক্ষণে ক্যাল্কেরিয়া সালফ ১২x দিনে ২ বার। ইহাতে সিস্টাস- ক্যান, হাইড্রোসট্রিস, হাইড্রোকোটাইল ভাল কাজ দেয়। ২১। জিহবা ও ঠোঁটের উপর ক্ষতে কলোফাইলাম ৩০. তিন ঘন্টান্তর। ২২। জিহ্বার উপর সাদা সাদা ক্ষতে কার্বো ভেজ ৩০, তিন ঘন্টাত্তর অথবা কেলি মিউর ৬%, ২ বড়ি দিনে ২ বার। ক্ষতে জ্বালা- ব্যথা ঠান্ডায় আরাম লক্ষণে লিডাম, এসিড ফ্লোর, পালস। আর গরমে আরাম-আর্স, সাইলি, ল্যাকেসিস, নাইট্রিক এসিড। ২৩। যাবতীয় আঘাতজনিত ক্ষতের মহৌষধ ক্যালেন্ডুলা Q/৩০ ব্যবহার্য। ২৪। আগুনের মত লালবর্ণের ক্ষতসমূহ সিনেবারিস ১x ৩x (ডাঃ বরিক)। ২৫। শয্যাক্ষত কার্বো-ভেজ ৩০/২০০ ।২৬। ক্ষত যাহা সহজে ভাল হইতে চায় না (জ্বালকর বেদনা) কার্বো- ভেজ ২০০ ক্রমোন্নত মাত্রায় ব্যবহার্য । ২৭। বার্ধক্যে পচনশীল ক্ষত যাহা পায়ের আঙ্গুলে শুরু হয় কার্বো-ভেজ (ডাঃ বরিক) ২০০ থেকে সেব্য । ২৮। জিহ্বা ও ঠোঁটের উপর সরের মত সাদা ক্ষত কলোফাইলাম (স্থানীক Q ও অভ্যন্তরীণ ৩০/২০০ থেকে) ব্যবহার্য । ২৯। শুকনা জাতীয় দুর্গন্ধপূর্ণ পচনশীল ক্ষত (বার্জার) কার্বো-এনি, এসিড নাইট্রক, কেলি-আয়োড ২০০ থেকে ।
পরিচ্ছন্নতা: ক্ষত স্থানটি সবসময় পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখুন। পরিষ্কার পানি বা পাতলা ক্যালেন্ডুলা মাদার টিঙ্কচার মিশ্রিত পানি দিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করা যেতে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের ক্ষতের প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীল হতে হবে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
পুষ্টিকর খাদ্য: ক্ষত দ্রুত শুকাতে ভিটামিন-সি (যেমন—লেবু, আমলকী) এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খান।
জরুরি সতর্কতা: যদি ক্ষত অত্যন্ত গভীর হয়, অনবরত ফিনকি দিয়ে রক্তপাত হতে থাকে, কিংবা লোহা বা নোংরা কিছু দিয়ে কাটার পর ধনুষ্টঙ্কারের (Tetanus) ঝুঁকি থাকে, তবে প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
হ্যাঁ, ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার পর অনেক সময় ত্বকে কালচে বা উচুঁ হয়ে কেলয়েড (Keloid) বা শক্ত দাগ থেকে যায়। এই ধরণের দাগ দূর করতে এবং ত্বকের স্বাভাবিক মসৃণতা ফিরিয়ে আনতে Thuja Occidentalis এবং Graphites অত্যন্ত কার্যকরী। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে এই ঔষধগুলো ব্যবহার করলে পুরনো ক্ষতের দাগ ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসে।
হঠাৎ কোনো অংশ পুড়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে আক্রান্ত স্থানে ঠাণ্ডা পানি দিতে হবে। হোমিওপ্যাথিতে পুড়ে যাওয়ার ক্ষতের জন্য Cantharis অত্যন্ত চমৎকার একটি ঔষধ। এটি ভেতর থেকে সেবনের পাশাপাশি এর মাদার টিঙ্কচার (Cantharis Mother Tincture) অলিভ অয়েল বা পানির সাথে মিশিয়ে ক্ষতস্থানে লাগালে পোড়া জায়গার জ্বালাপোড়া দ্রুত কমে এবং ফোসকা পড়া রোধ হয়।
একটি সাধারণ ক্ষত নির্দিষ্ট নিয়মে সময়ের সাথে সাথে শুকিয়ে যায় এবং ব্যথা কমতে থাকে। কিন্তু ক্ষতে যদি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা ইনফেকশন হয়, তবে ক্ষত স্থানটি অতিরিক্ত লাল হয়ে ফুলে ওঠে, অনবরত তীব্র বা দপদপানি ব্যথা থাকে, স্থানটি গরম হয়ে যায় এবং ক্ষত থেকে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বা তরল বের হতে পারে।
মোট 18টি ওষুধ
এই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও রোগ সম্পর্কে জানুন
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত
যোগাযোগ করুন