গর্ভাবস্থা (Pregnancy) একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় অথচ চ্যালেঞ্জিং একটি সময়। এই সময়ে শরীরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ধরণের শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দেয়। গর্ভকালীন প্রথম দিকে বমি বমি ভাব (Morning Sickness), মাথা ঘোরা এবং খাবারে অরুচি খুব সাধারণ বিষয়। আবার সময়ের সাথে সাথে পায়ে পানি আসা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বুক জ্বালাপোড়া, কোমর ব্যথা এবং মানসিক অস্থিরতা বা অনিদ্রার মতো সমস্যাগুলো প্রকট হতে পারে। এই উপসর্গগুলো স্বাভাবিক হলেও অনেক সময় তা গর্ভবতী মায়ের দৈনন্দিন জীবনকে কষ্টকর করে তোলে। গর্ভাবস্থার এই সব সমস্যা সমাধানে হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত নিরাপদ এবং কার্যকর একটি পথ। যেহেতু এই সময়ে কড়া বা রাসায়নিক যুক্ত ঔষধ সেবন গর্ভস্থ শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তাই লক্ষ লক্ষ মা প্রাকৃতিক ও মৃদু ক্রিয়াশীল হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ওপর ভরসা করেন। হোমিওপ্যাথি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই মায়ের জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করে এবং গর্ভাবস্থাকে আরও আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে সাহায্য করে। এটি কেবল উপসর্গই কমায় না, বরং প্রসব প্রক্রিয়াকে সহজ করতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।
(১) গর্ভাবস্থায় বমি : সাধারণ বমিভাবে ইপিকাক ৩০ দুঘন্টান্তর। (২) সর্ব প্রকার খাদ্যে বিরক্তি বা অরুচি, ক্রমাগত বমনোদ্বেগ ও রমন,মুখ দিয়ে পানি উঠা, তিক্ত আস্বাদ, কোষ্ঠকাঠিন্য লক্ষণে সিমফোরিকার্পাস রেসিমোসা ২০০ (চিৎ হয়ে শয়নে উপশম) দিনে ২ বার খাবে । (৩) কোন জিনিসের গন্ধে গা বমি-বমি তৎসহ মাথাঘোরা ককুলাস ৩০ তিন ঘন্টান্তর । (৪) খাওয়া মাত্রই বমি এবং খাদ্যের গন্ধে বমিভাব লক্ষণে আর্সেনিক ৩০, দিনে ২/৩ বার । (৫) খাদ্যের গন্ধে (বিশেষত রান্না করা খাদ্যের গন্ধে) গা বমি বমি করে (বিশেষতঃ মাছের গন্ধে) রোগিনী রন্ধনের গন্ধ মোটেই সহ্য করতে পারে না লক্ষণে কলচিকাম ৩০, দিনে ৩ বার। এর পর আর্সেনিক এবং আর্সের পর কলচিকাম ভাল ফল দেয়। (৬) খাওয়ার কিছুক্ষণ পর বমি হলে ফসফরাস ২০০। (৭) অনবরত বমি, বমির বিরাম নাই অবস্থায় অ্যাপোমফিয়া ৩০, ২/৩ ঘন্টাস্তর । (৮) অম্ল বমনে রোবিনিয়া ৩০ দু'ঘন্টাত্তর।
**(৯) কোন ঔষধে সুফল না পেলে লক্ষণ সাদৃশ্যে টিউবার ভিনাম বা মেডোরিনাম হাজার/দশ হাজার ব্যবহার্য । (১০) গর্ভাবস্থায় ৰমন ও গেঁটোবাত কলচিকাম অথবা কেলি সেলিসাইলিকাম ৩০, দিনে ২/৩ বার সেব্য। (১১) পানি দেখলেই বমি করে, স্নান করার সময় চোখ বন্ধ রাখতে হয়- ফসফরাস ২০০ (ডাঃ টাইলার)।
*** গর্ভাবস্থায় হিক্কাঃ ইহাতে সাইক্লামেন ৩০, অথবা বায়োকেমিক ম্যাগফস ৬x (২ বড়ি) ৩ ঘন্টাস্তর । গর্ভাবস্থায় কাশি—ইহাতে প্রথমে একোনাইট, ইপি, নাক্স, পালস ৩০। না কমলে কেলি ব্রোম ৩০, দিনে ২/৩ বার । তাতেও না সেরে মারাত্নক অবস্থা ধারণ করে গর্ভপাতের আশঙ্কা হলে ও কাশির রাত্রিকালীন বৃদ্ধি থাকলে কোনিয়াম ৩০/২০০ ব্যবহার্য । গর্ভাবস্থায় জরায়ু থেকে রক্তস্রাব হলে ইপিকাক ৩০ (বমিসহ),জিরেনিয়াম Q. ককুলাস, ক্রোকাস, ফস, সেবাইনা, সিকেলিকর-যে কোন একটি ২০০ শক্তি পরিবর্তন নিয়মে ৪ ঘন্টাত্তর সেব্য। রক্তস্রাবে খুব দুর্বল হলে চায়না Q বা ৩x ।
*আঘাত পাওয়ার কারণে রক্তস্রাব হলে আর্নিকা ২০০। গর্ভাবস্থায় রক্তস্রাবে মেডোরিনাম হাজার বা আরো উচ্চশক্তি পরিবর্তন নিয়মে ভাল কাজ দেয়। গর্ভাবস্থায় জরায়ু থেকে রক্তস্রাবে ইরিজিরন Q/৩x (ডাঃ বরিক) সুফলদায়ক। গর্ভবতী রমনীর যোনি চুলকালে কলিনসোনিয়া বা এড্রাসিয়া ৩০ অথবা কেলাডিয়াম ৩০, দিনে ২/৩ বার সেব্য। সিপিয়া, হেলোনিয়াস ভাল ঔষধ। যোনি কপাটে ক্ষতসহ চুলকানিতে মার্কসল ২০০, ২/১ ডোজ । ইচিনেসিয়া ) বা ক্যালেনডুলা Q দ্বারা বাহ্য লোশন ব্যবহার্য । গর্ভাবস্থায় পেট ব্যথা লক্ষণে আর্নিকা, নাক্স, পালস, সিপিয়া যে কোন একটি ৩০ শক্তিতে দিনে ২/৩ বার সেব্য। তলপেটে ব্যথায় সিমিসি বা কলোফাইলাম ৩০ । জরায়ুতে নিম্নাভিমুখী ব্যথা লক্ষণে কেলিকার্ব ২০০, ২/১ ডোজ । গর্ভাবস্থায় হাঁটাচলা খুবই কষ্টকর- বেলিস পিরে (ডাঃ টাইলার) । গর্ভাবস্থায় বমি ও পিঠ ব্যথা ককুলাস ইন্ডিকা ৩০, দিনে ২ বার খাবে (ডাঃ বরিক) । গর্ভাবস্থায় পিত্তজনিত অবস্থা চেলিডোনিয়াম ৩০, দিনে ২ বার খাবে ।
গর্ভাবস্থার বিভিন্ন স্তরে লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে নিচে কিছু নিরাপদ ঔষধের নাম দেওয়া হলো:
| ঔষধের নাম | ব্যবহারের লক্ষণ |
| Ipecac | গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অনবরত বমি বমি ভাব থাকলে, এমনকি বমি হওয়ার পরেও যদি অস্থিরতা না কমে। |
| Symphoricarpus | সকালবেলায় প্রচণ্ড বমি ভাব এবং খাবারের গন্ধে যদি অস্বস্তি বা বমি বেড়ে যায়। |
| Sepia | গর্ভাবস্থায় যদি প্রচণ্ড মানসিক অবসাদ, উদাসীনতা এবং তলপেটে ভারী বোধ অনুভূত হয়। |
| Nux Vomica | অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস বা রাত জাগার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং বারবার পায়খানার বেগ হলে। |
| Arnica Mont | গর্ভকালীন সময়ে জরায়ুর প্রসারণের ফলে যদি শরীরে বা পেশিতে কালশিটে পড়ার মতো ব্যথা হয়। |
| Pulsatilla | মেজাজ পরিবর্তন (Mood Swings), কান্নাকাটি করার প্রবণতা এবং খোলা বাতাসে থাকলে ভালো বোধ করলে। |
সুষম খাদ্য: পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম: দিনে অন্তত ২ ঘণ্টা এবং রাতে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করুন। বাম কাতে শোয়ার অভ্যাস করুন, এটি রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে।
হালকা ব্যায়াম: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হালকা হাঁটাচলা বা গর্ভকালীন ব্যায়াম করুন।
সতর্কতা: গর্ভাবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। তাই যেকোনো সামান্য উপসর্গ হলেও নিজে নিজে ঔষধ না খেয়ে একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস সকালে বমি ভাব হওয়া খুব স্বাভাবিক। এটি কমাতে সকালে ঘুম থেকে উঠে শুকনো খাবার যেমন—বিস্কুট বা মুড়ি খেতে পারেন। একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। আদা চা বা লেবুর শরবতও বমি ভাব কমাতে বেশ কার্যকর।
গর্ভাবস্থায় শরীরে প্রজেস্টেরন হরমোন বেড়ে যাওয়ার ফলে হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের সৃষ্টি করে। এছাড়া আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলেও এটি হতে পারে। এর প্রতিকারে প্রচুর পরিমাণে আঁশযুক্ত খাবার (সবজি, ফলমূল), ইসবগুলের ভুষি এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়া এবং জরায়ুর চাপের কারণে পায়ে হালকা পানি আসা স্বাভাবিক। তবে যদি পা ফোলার সাথে সাথে রক্তচাপ (Blood Pressure) বেড়ে যায় কিংবা প্রস্রাবে প্রোটিন ধরা পড়ে, তবে তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এমন অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মোট 36টি ওষুধ
এই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও রোগ সম্পর্কে জানুন
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত
যোগাযোগ করুন