কৃমি
All ৫৩ ভিউ

কৃমি

রোগ সম্পর্কে

কৃমি (Worms) মানুষের অন্ত্রে বসবাসকারী এক ধরণের পরজীবী যা শরীর থেকে পুষ্টি শোষণ করে বেঁচে থাকে। আমাদের দেশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দূষিত পানি, খালি পায়ে হাঁটা এবং কাঁচা বা আধাসিদ্ধ খাবার খাওয়ার ফলে কৃমি সংক্রমণ খুব বেশি দেখা যায়। সাধারণত ফিতাকৃমি, গোলকৃমি, হুকওয়ার্ম এবং সুতাকৃমি আমাদের শরীরে বাসা বাঁধে। কৃমির ফলে পেট ব্যথা, মলদ্বারে চুলকানি, খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব এবং শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কৃমির সমস্যা সমাধানে হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এবং নিরাপদ পদ্ধতি। বাজারের প্রচলিত কৃমির ঔষধ অনেক সময় কৃমি মারলেও এর ডিম বা লার্ভা ধ্বংস করতে পারে না, ফলে পুনরায় কৃমি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু হোমিওপ্যাথি ঔষধ শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এমনভাবে পরিবর্তন করে দেয় যাতে কৃমি আর বেঁচে থাকতে পারে না। এটি কোনো বিষক্রিয়া ছাড়াই শরীর থেকে প্রাকৃতিকভাবে কৃমি বের করে দেয় এবং কৃমিজনিত কারণে হওয়া পেটের সমস্যা ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে সাহায্য করে।

বিস্তারিত চিকিৎসা পদ্ধতি

লক্ষণ অনুযায়ী প্রধান হোমিওপ্যাথিক ঔষধ (Treatment Overview)

কৃমির ধরন ও উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে নিচে কিছু কার্যকরী ঔষধের নাম দেওয়া হলো:

ঔষধের নাম ব্যবহারের লক্ষণ
Cina শিশুদের কৃমির প্রধান ঔষধ। শিশু যদি নাক খুঁটে, ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করে এবং অত্যন্ত খিটখিটে মেজাজের হয়।
Teucrium M.V. যদি মলদ্বারে প্রচণ্ড চুলকানি থাকে (বিশেষ করে রাতে) এবং মনে হয় যেন মলদ্বারে কিছু সুড়সুড় করছে।
Santoninum যদি কৃমির কারণে পেটে তীব্র ব্যথা থাকে এবং প্রস্রাব হলুদ বর্ণের হয়। এটি গোলকৃমির জন্য খুব ভালো কাজ করে।
Spigelia যদি কৃমির কারণে নাভির চারপাশে ব্যথা হয় এবং হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক মনে হয়।
Calcarea Carb মোটা সোটা ও থলথলে শিশুদের ক্ষেত্রে যাদের মাথায় ঘাম হয় এবং ঘনঘন কৃমিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে।
Cuprum Oxyd Nig এটি সব ধরণের কৃমি, বিশেষ করে ফিতাকৃমি (Tapeworm) নির্মূলে অত্যন্ত শক্তিশালী।

১। প্রায় সকল প্রকার ক্রিমিতেই বয়স অনুযায়ী কুপ্রাম অক্সিডেটাম ৩, ১-৩ গ্রেন পরিমান সকালে কিছু খাওয়ার পর ১ মাত্রা এবং রাত্রে নিদ্রার পূর্বে নাক্স ৩০ দিলে সুন্দর ফল পাওয়া যায় Dr. Zoply সাহেবের ৬০ বৎসরের অভিজ্ঞতা থেকে এটা জানা গেছে (ডাঃ বরিক)। ২। নাক খোঁটা, দাঁত কড়মড় করা, ঘুমের মধ্যে চমকাইয়া উঠা, খিটখিটে মেজাজ, খুব ক্ষুধা অথবা ক্ষুধাহীনতা, চোখের কোনে কালি জমা বা মুখের চারদিকে Blue ring or gray steak, উপর হইয়া শয়ন লক্ষণে সিনা ২০০, দিনে ১ বার, ৩ দিন সেবা। *৩। কৃমির কারণে পেট ব্যথা করিলে সেবাডিলা ৩x, বা স্ট্যানাম ৩x ১ গ্রেগ আধ ঘন্টাস্তর ২/৩ ডোজ অথবা সাইলিসিয়া বা নেট্রাম ফস ৩x, ব্যবহার্য। ৪। শিশু অনবরত গ্রহ্যদ্বার চুলকায়, গুহ্যদ্বারে ছোট কৃমি ঘুরিয়া বেড়ায়, নিদ্রিত অবস্থায় কৃমি মলদ্বারের বাহিরে চলিয়া আসে লক্ষণে ইন্ডিগো ৩x অথবা টিউক্রিয়াম ৩x দিনে ৩/৪ বার, ২ দিন সেব্য । অথবা মার্কসল হাজার সকালে ১ বার, ২ দিন। ৫। মলের সহিত অসংখ্য ছোট কৃমি নির্গত হইলে স্পাইজেলিয়া ৩, দিনে ৪/৫ বার, ৩ দিন সেব্য ছোট ছোট কৃমিতে সিনাপিস নাইগ্রা, আর্টিকা ইউরেন্স, রেটানহিয়া, গ্রেনেটাম, আটিষ্টা ইন্ডিকা-যে কোন একটি ৩ দিনে ৪/৫ বার সেবনে সুন্দর ফল দেয় । *৬। মুখ দিয়া এবং মলের সাথে বড় কৃমি (কেঁচো কৃমি) বাহির হইলে সোডিলা ৩, দুই ঘন্টাত্তর অথবা সিনা ৩x দুই ঘন্টাস্তর ৫/৬ ডোজ সেবনীয় ।

*৭। ডাঃ এলেন বলেন-সিরিনাম ২০০ দুই দিন অন্তর ১ মাত্রা (মোটা ৩ মাত্রা) সেবনে কেঁচো কৃমি বাহির হইয়া যায় । *৮ । ডাঃ বরিকের মতে মানব দেহের সকল প্রকার কৃমির মহৌষধ চিলোন গ্লাব্রা। ইহার Q, পাঁচ ফোঁটা পরিমাণে দিনে ১ বার (৪/৫ দিন সেব্য) । ৯ । ফিতা কৃমির সুন্দর ঔষধ এ্যানেটাম বা ফিলিক্স মাস ৩x দিনে ২ বার (৪/৫ দিন সেব্য)। *১০। কৃমির কারণে আক্ষেপ দেখা দিলে সিনা ৩x ১০/১৫ মি. অন্তর অথবা কুপ্রাম মেট ৩০, এক ঘন্টাস্ত র কিংবা প্যাসিফ্লোরা Q, দশ ফোঁটা মাত্রায় আধ ঘন্টাত্তর । *১১। বায়োকেমিক কেলিমিউর ৬x সকালে গরম পানিসহ ৫ বড়ি ও রাত্রে নেট্রাম ফস ৩x, ৫ বড়ি কিছুদিন সেবনে সকল প্রকার কৃমি নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। (শিশুদের জন্য ২ বড়ি)। ১২। হুকওয়ার্ম এর জন্য চেনোপোডিয়াম এনথেলমিন্টিকাম ৩০, দিনে ২ বার । ১৩। কৃমির জন্য জ্বর হইলে সিনা ৩০ তিন ঘন্টাত্তর অথবা জ্বর সহ আমাশয় থাকিলে আটিষ্টা ইন্ডিকা ( তিন ফোঁটা মাত্রায় ৪ ঘন্টাত্তর প্রয়োগ বিধেয়। ১৪ । কৃমিজনিত টেরা দৃষ্টিতে সিনা ২০০, স্পাইজেলিয়া ২০০, নেট্রাম ফস ২০০x, যে কোন একটি সপ্তাহে ১ বার ব্যবহার্য। ১৫ । জিয়ার্ডিয়া-জ অধ্যায়ে দেখুন । মলদ্বারে ছোট কৃমির উৎপাত তৎক্ষনাৎ বন্ধ করার জন্য রেটানহিয়া Q অলিভ ওয়েলের সাথে মিশিয়ে তথায় লাগাবেন। ১৬। কেঁচো ও সূতা কৃমির জন্য চিলোন গ্লাব্রা সুন্দর ঔষধ (ডাঃ বরিক)।

 

বিঃ দ্রঃ কৃমির একটি সাধারন চিকিৎসা--রোজ ১ বার করে সকালে ৪ দিন সিনা ২০০ দিবে। ১ সপ্তাহ পর সালফার ২০০ এক ডোজ দিবে। তারপরও কৃমির উপদ্রব থেকে গেলে ঐ ব্যবস্থাটা Repeat করবেন ।কৃমির উপদ্রব একটি সোরিক সমস্যা। ধাতুগত ভাবে এর = সমাধান করার জন্য সহজতর উপায় হলো সালফার ২০০ দিয়ে = চিকিৎসা আরম্ভ করা। সপ্তাহ খানেক পর রোগীর ধাতুগত ঔষধটি প্রদানে রোগী নির্মল আরোগ্য হয় । কৃমি ধাতুতে সদৃশ্য ঔষধে যেখানে কাজ হয় না অথবা আংশিক কাজ করে সেখানে কার্সিনোসিন আরোগ্য করে ২০০ থেকে সেব্য ।

প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সতর্কতা

  • পরিচ্ছন্নতা: খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। শিশুদের নখ ছোট রাখুন।

  • খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো কৃমি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সবসময় নিরাপদ পানি পান করুন।

  • সতর্কতা: পরিবারের একজনের কৃমি হলে সাধারণত সবারই চিকিৎসা নেওয়া ভালো, কারণ এটি খুব দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়।

রোগ সম্পর্কিত প্রশ্ন

কৃমি হওয়ার প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?

কৃমি হলে সাধারণত পেট ব্যথা, খাবারে অরুচি, মলদ্বারে চুলকানি (বিশেষ করে রাতে), এবং ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করার মতো লক্ষণ দেখা যায়। এছাড়া শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং খিটখিটে মেজাজও কৃমির লক্ষণ হতে পারে।

মিষ্টি খেলে কি সত্যিই কৃমি বাড়ে?

মিষ্টি সরাসরি কৃমি তৈরি করে না, তবে কৃমিরা চিনি বা শর্করা জাতীয় খাবার পছন্দ করে। অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে অন্ত্রের পরিবেশ কৃমির বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল হয়ে ওঠে, ফলে কৃমির উপদ্রব এবং এর ফলে হওয়া অস্বস্তি বেড়ে যায়।

হোমিওপ্যাথি ঔষধ কি কৃমির ডিম ধ্বংস করতে পারে?

প্রচলিত অনেক ঔষধ কেবল জীবিত কৃমি বের করে দেয়, কিন্তু হোমিওপ্যাথি ঔষধ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে অন্ত্রের পরিবেশকে এমনভাবে উন্নত করে যেন কৃমির ডিম বা লার্ভা সেখানে টিকতে না পারে। এটি কৃমি হওয়ার প্রবণতা (Tendency) স্থায়ীভাবে দূর করতে সাহায্য করে।

হোসনেআরা হিমু

হোমিও বিশেষজ্ঞ

ডা. হোসনে আরা একজন অভিজ্ঞ ও সেবাপরায়ণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। তিনি...

শেয়ার করুন