প্রসবোত্তরকাল (Postpartum Period) বা সন্তান প্রসবের পরবর্তী ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ মায়েদের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সময়। এই সময়ে একজন মায়ের শরীর গর্ভাবস্থার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে শুরু করে। দীর্ঘ ৯ মাসের ধকল এবং প্রসব বেদনার পর নতুন মায়েদের শরীর ও মনে ব্যপক হরমোনজনিত এবং গাঠনিক পরিবর্তন ঘটে। এই সময়টাতে মায়েরা নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন। যেমন—জরায়ুর সংকোচনজনিত তীব্র ব্যথা (After-pains), প্রসব পরবর্তী স্বাভাবিক রক্তক্ষরণ বা 'লোচিয়া' (Lochia) অতিরিক্ত হওয়া, প্রসবদ্বারের ক্ষত বা টাঁকার ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, স্তনে অতিরিক্ত দুধ জমার কারণে তীব্র স্তনপ্রদাহ (Mastitis) এবং চরম শারীরিক ক্লান্তি বা অ্যানিমিয়া। এর পাশাপাশি হরমোনের আকস্মিক ওঠানামার কারণে অনেক মা 'পোস্টপার্টাম ব্লুজ' বা গভীর মানসিক অবসাদ, খিটখিটে মেজাজ ও তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগেন, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (Postpartum Depression) বলা হয়।প্রসব পরবর্তী এই বহুমুখী শারীরিক ও মানসিক ধকল কাটিয়ে উঠতে হোমিওপ্যাথি একটি অত্যন্ত মৃদু, নিরাপদ এবং স্থায়ী চিকিৎসাপদ্ধতি।হোমিওপ্যাথিক ঔষধ জরায়ুর অভ্যন্তরীণ ক্ষত ও রক্তক্ষরণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করে, প্রসবের শারীরিক ট্রমা দূর করে, স্তনে দুধের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে এবং হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে নতুন মায়ের মানসিক অবস্থাকে দ্রুত শান্ত ও প্রফুল্ল করে তুলতে সাহায্য করে।
প্রসবোত্তরকালের বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহৃত প্রধান কিছু ঔষধ:
| ঔষধের নাম | ব্যবহারের লক্ষণ |
| Arnica Montana | প্রসবের পর সারা শরীরের থেঁতলে যাওয়ার মতো ব্যথা, মাংসপেশির চরম ক্লান্তি এবং ভেতরের কোনো আঘাত বা ক্ষত প্রাকৃতিকভাবে শুকাতে এটি এক নম্বর ঔষধ। |
| Secale Cornutum / Sabina | প্রসবের পর যদি জরায়ু ঠিকমতো সংকুচিত না হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কালচে বা লালচে রক্তক্ষরণ (Lochia) হতে থাকে এবং তলপেটে মোচড়ানো ব্যথা থাকে। |
| Sepia | পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের জন্য এটি সেরা ঔষধ। সন্তান প্রসবের পর মায়ের মনে যদি চরম উদাসীনতা দেখা দেয়, নিজের শিশু ও পরিবারের প্রতি ভালোবাসা কমে যায় এবং সবসময় কান্না করার প্রবণতা থাকে। |
| Phytolacca Decandra | স্তনে অতিরিক্ত দুধ জমার কারণে যদি স্তন শক্ত ও পাথরের মতো ভারী হয়ে যায়, বোঁটায় ফাটল ধরে এবং শিশু দুধ চোষার সময় তীব্র ব্যথা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। |
| China Officinalis (Cinchona) | প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্ত ও তরল ক্ষরণের ফলে মা যদি চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন, চোখে অন্ধকার দেখেন এবং হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে (রক্তস্বল্পতা দূর করতে কার্যকর)। |
**(১) প্রসবের পর ভ্যাদান ব্যথা (after pain), প্রসবাস্তিক ক্ষতাদি ও পার বেদনার জন্য ফেরাম ফস অদ্বিতীয় । ইহা প্রসবের পর ব্যবহারে যাবতীয় কম কোন টেকনা ভবিষ্যৎ পীড়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করা যায় । শক্তি ৬x । প্রসবের পর প্রথম আর্নিকা ৩০ দুঘন্টাত্তর ২৪ ঘন্টা যাবৎ দেয়ার পর সন্তান সিমিসিফিউগা ৩০ চার ঘন্টাত্তর ব্যবহার্য। এতে জরায়ুর সংকোচন, তাদাল, ব্যথা, সুতিকা জ্বর, উন্মাদ, লোকিয়াস্রাবে উপকার হবে ।
(২) প্রসবের পর রক্তস্রাব ঃ প্রথমে আর্নিকা ৩০ দু/চার ডোজ দিয়ে পরে লক্ষণাসুসারে চায়না Q. ফেরামফস ৬x. ইপিকাক ৩x. সেবাইনা ২০০, ট্রিলিয়াম Q যে কোন একটি ঔষধ ব্যবহার্য । কালরক্ত হলে ফেরাম ফস আর উজ্জ্বল লাল রক্ত হলে সিনামোনাম Q. মেলিফোলিয়াম ৬, সেবাইনা ২০০, ট্রিলিয়াম Q ব্যবহার্য । অবিরাম বেশী পরিমাণে রক্ত যেতে থাকলে হায়োসিয়েমাস ৩০, মেলিফোলিয়াম ৬ বা ইপিকাক ৩x ব্যবহার্য । ধীরে ধীরে রক্ত যেতে থাকলে হেমামেলিস ৩০। Hasty labour-এর পর হলে কলোফাইলাম, আর Instrumental labour-এর পর হলে আর্নিকা ব্যবহার্য । খুব বেশী রক্ত যেতে থাকলে কলোফাইলাম, সিনামন, হেমামেলিস, সেবাইনা, ইপিকাক যে কোন একটি ব্যবহার্য। জরায়ুর মুখ সঙ্কুচিত না হয়ে প্রচুর রক্ত যেতে থাকলে কলোফাইলাম ৩x ব্যবহার্য । স্তনে দুধ না থাকলে-নেট্রাম-মি ২০০, এগনাস Q । প্রসবের পর মায়ের প্রস্রাব না হলে কষ্টিকাম (আর্স, প্লাম্বাম)।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম: নবজাতকের ঘুমের সময়ের সাথে মিলিয়ে নতুন মায়েরও পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম অত্যন্ত জরুরি, যা শরীরকে দ্রুত নিরাময় হতে সাহায্য করে।
আয়রণ ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে খাদ্যতালিকায় ডিম, দুধ, তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি এবং প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার রাখুন।
মানসিক সহযোগিতা: পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা মানসিক জটিলতা এড়াতে পরিবারের সদস্যদের হবু মায়ের প্রতি যত্নশীল হতে হবে এবং তাকে সবসময় প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করতে হবে।
সন্তান প্রসবের ঠিক পর থেকে পরবর্তী ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রসবোত্তরকাল বা পিউর্পেরিয়াম (Puerperium) বলা হয়। এই সংবেদনশীল সময়ে একজন মায়ের শরীর, জরায়ু এবং হরমোনের মাত্রা গর্ভাবস্থার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করে।
এই সময়ে নতুন মায়েরা নানাবিধ সমস্যায় ভুগতে পারেন। যেমন—জরায়ু সংকুচিত হওয়ার কারণে তলপেটে তীব্র কামড়ানো ব্যথা (After-pains), প্রসব পরবর্তী স্রাব বা লোচিয়া (Lochia) অতিরিক্ত হওয়া, প্রসবদ্বারের বা সিজারের ক্ষতের ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, চরম শারীরিক ক্লান্তি এবং স্তনে অতিরিক্ত দুধ জমে শক্ত ও কালচে হয়ে যাওয়া (Mastitis)।
সন্তান প্রসবের পর মায়েদের শরীরে এস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ করে খুব দ্রুত কমে যায়। এই হরমোনাল ওঠানামা, নতুন দায়িত্বের চাপ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে অনেক মায়ের মধ্যে তীব্র মানসিক অবসাদ, উদাসীনতা, কোনো কারণ ছাড়াই কান্নাকাটি করা বা সন্তানের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। একেই পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বলা হয়।
মোট 16টি ওষুধ
এই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও রোগ সম্পর্কে জানুন
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত
যোগাযোগ করুন