প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়া
Female ৫৩ ভিউ

প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়া

রোগ সম্পর্কে

প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়া বা পেরিনিয়াল টিয়ার (Perineal Tear) হলো স্বাভাবিক প্রসবের (Normal Delivery) সময় নারীদের যোনিপথ এবং পায়ুপথের মধ্যবর্তী অংশ (Perineum) ফেটে বা ছিঁড়ে যাওয়ার একটি অত্যন্ত সাধারণ অথচ বেদনাদায়ক জটিলতা। প্রথমবার মা হওয়ার সময়, প্রসবের গতি খুব দ্রুত হলে, কিংবা শিশুর মাথার আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হলে এই অংশের পেশির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যার ফলে ত্বক ও নরম টিস্যুগুলো ছিঁড়ে যায়। ক্ষতের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে এটিকে প্রথম থেকে চতুর্থ ডিগ্রি পর্যন্ত ভাগ করা হয়। অনেক সময় চিকিৎসকরা প্রসব সহজ করতে নিজে থেকেই এই অংশটি সামান্য কেটে দেন, যাকে 'এপিসিওটমি' (Episiotomy) বলা হয়। প্রসব পরবর্তী সময়ে এই কাটা বা ছেঁড়া স্থানে তীব্র ব্যথা, জ্বালাপোড়া, বসার অসুবিধা এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা নতুন মায়েদের শারীরিক ও মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হওয়ায় তা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই নিরাপদ। এই চিকিৎসা পদ্ধতি জরায়ু ও যোনিপথের পেশির শিথিলতা দূর করে, রক্ত সঞ্চালন সচল রাখে এবং ইনফেকশন বা পুঁজ হওয়া রোধ করে ক্ষত স্থানটিকে প্রাকৃতিকভাবে ও খুব দ্রুত জোড়া লাগাতে সাহায্য করে।

বিস্তারিত চিকিৎসা পদ্ধতি

লক্ষণ ও ক্ষতের অবস্থা অনুযায়ী প্রধান হোমিওপ্যাথিক ঔষধ (Treatment Overview)

প্রসবদ্বারের ক্ষত ও ব্যথার ধরণ অনুযায়ী ব্যবহৃত কিছু প্রধান অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঔষধ:

ঔষধের নাম ব্যবহারের লক্ষণ
Staphysagria প্রসবদ্বার কেটে যাওয়া বা এপিসিওটমির টাঁকা লাগানোর ক্ষতের জন্য এটি এক নম্বর ঔষধ। ধারালো অস্ত্রের কাটার মতো তীব্র ব্যথা এবং টাঁকা দ্রুত শুকাতে এটি অতুলনীয়।
Calendula Officinalis এটি প্রসব পরবর্তী ক্ষতের জন্য একটি জাদুকরী ঔষধ। ক্ষত শুকাতে এবং ইনফেকশন বা পচন রোধ করতে এর অভ্যন্তরীণ সেবনের পাশাপাশি বাহ্যিক ব্যবহার (Mother Tincture মিশ্রিত পানি দিয়ে ধোয়া) অত্যন্ত কার্যকরী।
Arnica Montana প্রসবের সময় অতিরিক্ত চাপ ও টানের কারণে যদি প্রসবদ্বার ও চারপাশের পেশি থেঁতলে যায়, ফুলে ওঠে এবং সারা শরীরে কালশিটে পড়ার মতো প্রচণ্ড ব্যথা থাকে।
Hypericum Perforatum

যদি প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে ওখানকার সংবেদনশীল স্নায়ু বা নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তীব্র শূলানি বা তীরবিদ্ধ হওয়ার মতো ব্যথা ও অবশ ভাব থাকে।

 

Belladonna ক্ষতের স্থানটি যদি অতিরিক্ত লাল হয়ে ফুলে যায়, দপদপানি ব্যথা থাকে এবং আক্রান্ত স্থান থেকে গরম ভাপ বের হওয়ার মতো অনুভূতি হয়।

 

সন্তান বড় হবার দরুণ অথবা যোনিদ্বার ছোট হলে প্রসবের সময় প্রসব হার ছিড়ে যেতে পারে । ইহাতে আর্নিকা ৩০ তিন ঘন্টাত্তর আভ্যন্তরীন প্রয়োগ এবং ক্যালেন্ডুলা (Q) দ্বারা লোশন তৈরী করে বাহ্য প্রয়োগ বিশেষ। এতে না সারলে এবং ব্যথা-বেদনা করলে হিপার সালফ ২০০ আর পুঁজ হলে সাইলসিয়িা ২০০/ হাজার শক্তি পরিবর্তন নিয়মে প্রযোজ্য । ছেঁড়া অংশ সেলাই করা উচিত হবে ।

প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সতর্কতা

  • পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: প্রতিবার শৌচকার্য সম্পাদন করার পর প্রসবদ্বারের চারপাশ ভালো করে পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখতে হবে। হালকা কুসুম গরম পানিতে কয়েক ফোঁটা ক্যালেন্ডুলা মাদার টিঙ্কচার মিশিয়ে আলতো করে ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে।

  • বসার ক্ষেত্রে সতর্কতা: ক্ষতস্থানে সরাসরি চাপ এড়াতে বসার সময় নরম কুশন বা 'ডোনাট পিলো' (মাঝখানে ফাঁপা বালিশ) ব্যবহার করা উচিত।

  • কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ: এই সময়ে কোষ্ঠকাঠিন্য হলে মলত্যাগের চাপে প্রসবদ্বারের টাঁকা ছিঁড়ে যেতে পারে। তাই প্রচুর পানি, আঁশযুক্ত খাবার এবং প্রয়োজনবোধে কোষ্ঠকাঠিন্যের হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবন করা উচিত।

  • বিশ্রাম: প্রসবের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং ভারী কোনো জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম থেকে বিরত থাকুন।

রোগ সম্পর্কিত প্রশ্ন

প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়া (Perineal Tear) আসলে কী?

স্বাভাবিক প্রসবের (Normal Delivery) সময় শিশুর মাথা ও শরীর বের হওয়ার সুবিধার্থে জরায়ুর মুখ এবং যোনিপথ অতিরিক্ত প্রসারিত হয়। এই সময় চাপের তীব্রতায় যোনিপথ এবং পায়ুপথের মধ্যবর্তী নরম টিস্যু বা পেশি যদি ফেটে বা ছিঁড়ে যায়, তবে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পেরিনিয়াল টিয়ার বা প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়া বলা হয়।

এপিসিওটমি (Episiotomy) এবং প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য কী?

প্রসবদ্বার ছিঁড়ে যাওয়া হলো একটি আকস্মিক বা প্রাকৃতিক ঘটনা যা প্রসবের চাপের কারণে নিজে থেকেই ঘটে। অন্যদিকে, প্রসবের রাস্তা সহজ করতে এবং বড় কোনো জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকরা যখন প্রসবের ঠিক পূর্বে স্থানীয়ভাবে অবশ করে নিজে থেকে প্রসবদ্বার সামান্য কেটে দেন, তাকে এপিসিওটমি বা 'ডাক্তারি কাটা' বলা হয়। নিরাময়ের ক্ষেত্রে উভয় ক্ষতের জন্যই একই ধরণের যত্ন ও চিকিৎসা প্রয়োজন।

সন্তান প্রসবের পর এই ক্ষত শুকাতে সাধারণত কতদিন সময় লাগে?

ক্ষতের গভীরতা এবং টাঁকার (Stitches) সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সময় কম-বেশি হতে পারে। সাধারণত হালকা বা মাঝারি ধরণের ক্ষত এবং এপিসিওটমির টাঁকা ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে যায়। তবে ভেতরের পেশি বা গভীর টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

হোসনেআরা হিমু

হোমিও বিশেষজ্ঞ

ডা. হোসনে আরা একজন অভিজ্ঞ ও সেবাপরায়ণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। তিনি...

শেয়ার করুন