মাতৃদুগ্ধ উপসর্গ
Female ৭৪ ভিউ

মাতৃদুগ্ধ উপসর্গ

রোগ সম্পর্কে

মাতৃদুগ্ধ উপসর্গ (Breastfeeding Complications / Lactation Disorders) বলতে সন্তান প্রসবের পর মায়েদের স্তন্যদান বা বুকের দুধ তৈরি ও প্রবাহজনিত নানাবিধ শারীরিক সমস্যা ও লক্ষণকে বোঝায়। নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠন এবং সুস্থ বেড়ে ওঠার জন্য মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই। তবে অনেক নতুন মা এই সময়ে বিভিন্ন ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। এর মধ্যে অন্যতম হলো—বুকের দুধ একদমই না হওয়া বা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি না হওয়া (Agalactia/Hypogalactia), যার ফলে শিশু ক্ষুধার্ত ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে বিপরীত সমস্যা দেখা দেয়, যেমন—প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত দুধ তৈরি হওয়া বা স্তন্যদান না করা সত্ত্বেও অনবরত দুধ ঝরতে থাকা (Galactorrhea)। এছাড়া সঠিক নিয়মে শিশু দুধ না চুষলে বা স্তনের দুধ পুরোপুরি খালি না হলে স্তন শক্ত, পাথরের মতো ভারী ও লাল হয়ে প্রচণ্ড দপদপানি ব্যথা হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'ম্যাসটাইটিস' (Mastitis) বা স্তনপ্রদাহ বলা হয়। এর সাথে স্তনের বোঁটা ফেটে যাওয়া (Cracked Nipples) এবং তীব্র যন্ত্রণার কারণে অনেক মায়ের পক্ষে শিশুকে দুধ খাওয়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।মাতৃদুগ্ধের এই সমস্ত সংবেদনশীল উপসর্গের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি একটি অত্যন্ত মৃদু, নিরাপদ এবং জাদুকরী চিকিৎসাপদ্ধতি।

বিস্তারিত চিকিৎসা পদ্ধতি

উপসর্গের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রধান হোমিওপ্যাথিক ঔষধ (Treatment Overview)

বুকের দুধের বিভিন্ন সমস্যা ও লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহৃত প্রধান কিছু ঔষধ:

ঔষধের নাম ব্যবহারের লক্ষণ
Ricinus Communis মায়েদের বুকের দুধ বাড়ানোর জন্য এটি হোমিওপ্যাথির অন্যতম সেরা ঔষধ। প্রসবের পর যদি স্তনে দুধের উৎপাদন একেবারেই কম বা না থাকে, তবে এর নিম্ন শক্তি (3X/6C) ব্যবহারে দুধের প্রবাহ দ্রুত বাড়ে।
Phytolacca Decandra স্তনে অতিরিক্ত দুধ জমার কারণে যদি স্তন শক্ত ও পাথরের মতো ভারী হয়ে যায়, বোঁটায় ফাটল ধরে এবং শিশু দুধ চোষার সময় তীব্র ব্যথা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
Asafoetida মায়েদের জরায়ুর বা মানসিক কোনো গোলযোগের কারণে যদি স্তনে দুধের অভাব হয় এবং তার সাথে পেটে প্রচুর গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা থাকে।
Conium Maculatum স্তন্যদানকালীন সময়ে বা প্রসবের পর কোনো আঘাতের কারণে যদি স্তনের ভেতরে ছোট ছোট শক্ত চাকা বা টিউমারের মতো গ্ল্যান্ড ফুলে ওঠে এবং হাত দিলে ব্যথা লাগে।
Pulsatilla Nigricans যে সমস্ত মায়েরা অত্যন্ত নরম মনের ও খিটখিটে মেজাজের হন এবং যাদের বুকের দুধের পরিমাণ কখনো ভালো থাকে আবার কখনো হঠাৎ কমে যায় (অনিয়মিত প্রবাহ)।

মাতৃদুগ্ধ- (ক) দুধের অভাবে রিসিনাস ৩, ল্যাকডিফ্লোর ৬ অথবা এগনাস Q. আর্টিকা ইউরেন্স Q ৫ ফোঁটা মাত্রায় রোজ ৪/৫ বার সেব্য । *When a mother says she has no milk, or that the milk is scanty, thick, unhealthy, dries up soon. Phytolacca becomes then a Constiutional Remedy- Dr. kent. (খ) দুধ ঝড়তে থাকলে বোরাক্স ৩০, স্পাইরেনথিস আলমেরিয়া ৩, ৩x, বেল, ব্রায়ো, ক্যাল্কে কার্ব, পালস ৩০/২০০ শক্তিতে ব্যবহার্য। (গ) দুধের ফ্লো বন্ধ বা বাধাগ্রস্থ থাকলে ল্যাকডিফ্লোরেটাম, বেল, ডালকা, পালস । (ঘ) দুধ নষ্ট হয়ে গেলে—ইথুজা, সিনা, সাইলিসিয়া ৩০/২০০ থেকে ব্যবহার্য। (ঙ) দুধ বন্ধ করার (to Suppress) জন্য- ল্যাকক্যান, ২০০ থেকে ব্যবহার্য। (চ) দুধের নিপলের ছাল উঠে গেলে- আর্নিকা, পালস ৩০ থেকে ব্যবহার্য এবং শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় ব্যথা করলে ব্রায়ো, মার্কসল, বোরাক্স, পালস, সাইলি, ষ্ট্যাফি, সালফার ৩০/২০০ শক্তিতে ব্যবহার্য।

*(ছ) স্তনে দুধ এসে ফুলে যায় ও ব্যথা করে লক্ষণে ব্রায়ো, ফাইটো ২০০ থেকে (পালস, ল্যাকক্যান) ।শিশু মায়ের দুধ না খেলে- (ক) দুধ গাঢ় ও বিস্বাদ হলে বোরাক্স, ফাইটোলাক্কা । (খ) দুধ লবণাক্ত হলে- কার্বো এনি, (গ) দুধ তিতা হলে- রিউম। (ঘ) দুধ পানির মত পাতলা হলে- মার্ক, কার্বো এনি, ক্যাঙ্কে ফস। (ঙ) দুধ রক্ত মিশ্রিত হলে- কষ্টি, পালস, ব্রায়ো, বিউফো। (চ) দুধ নীল রংয়ের হলে- ল্যাকেসিস । শক্তি ৩০/২০০ দিনে ২/১ বার সেব্য ।

অপুষ্টির কারণে শিশু মায়ের দুধ প্রত্যাখ্যান করে বা না খেলে, শিশুর পেটের অসুখ বা বমি দেখা দেয় লক্ষণে ক্যাঙ্কে ফস, বোরাক্স, ইথুজা, এন্টিম ক্রুড, সাইলি ৩০/২০০ থেকে ব্যবহার্য। ** এই অবস্থায় স্তন দুগ্ধকে রুচিকর করতে লেসিথিন ( বা ১২ দিনে ৩/৪ বার অথবা ক্যাঙ্কে ফস ১২x চার বড়ি দিনে ২/১ বার সেব্য। Dr. George Royal, "Calcarea carb is a good remedy to modify both the quantity and quality of breast milk When the flow of milk is excessive, the child does not like it or does not thrive on it. the use of 6 or 30th of Calc Carb will often secure the desired result. Give it three times daily for three to four weeks."

** স্তনে দুধ বৃদ্ধি করতে রিসিনাস ৩, ৪ ঘন্টান্তর ২ ফোটা করে সেব্য (ডাঃ বরিক)।

স্তন্যদায়ী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ঘরোয়া যত্ন

  • সঠিক উপায়ে স্তন্যদান (Proper Latch): শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় যেন সে কেবল বোঁটা নয়, চারপাশের কালো অংশটিও (Areola) মুখের ভেতর নেয়। এতে বোঁটা ফাটার ঝুঁকি কমে এবং দুধের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে।

  • স্তনের যত্ন ও সেঁক: স্তন শক্ত হয়ে ব্যথা হলে হালকা কুসুম গরম পানির সেঁক দিয়ে আলতো হাতে ম্যাসাজ করলে ভেতরের জমে থাকা দুধের নালীগুলো খুলে যায়।

  • পুষ্টিকর ও তরল খাবার: বুকের দুধের উৎপাদন বাড়াতে নতুন মায়ের খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন প্রচুর পানি, তরল খাবার (স্যুপ, দুধ), কালোজিরা, লাউ এবং ওটমিল রাখুন।

রোগ সম্পর্কিত প্রশ্ন

১. প্রসবের পর বুকের দুধ কম হওয়া বা না হওয়ার প্রধান কারণগুলো কী কী?

নতুন মায়েদের বুকের দুধ কম হওয়ার পেছনে প্রধানত পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব, মানসিক দুশ্চিন্তা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা (যেমন—প্রোল্যাক্টিন হরমোনের ঘাটতি), পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং শিশুকে নিয়মিত বুক না খাওয়ানো অন্যতম কারণ হতে পারে।

স্তন শক্ত হয়ে যাওয়া বা ম্যাসটাইটিস (Mastitis) কেন হয়?

স্তনে যদি অতিরিক্ত দুধ জমে থাকে এবং তা নিয়মিত খালি না করা হয়, তবে দুধের নালীগুলো (Milk ducts) বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে স্তন শক্ত, লাল ও পাথরের মতো ভারী হয়ে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ম্যাসটাইটিস বা স্তনপ্রদাহ বলা হয়। অনেক সময় এর সাথে মায়ের প্রচণ্ড জ্বরও আসতে পারে।

স্তনের বোঁটা ফেটে গেলে বা ক্ষত হলে (Cracked Nipples) করণীয় কী?

এটি স্তন্যদানকালীন মায়েদের একটি অত্যন্ত সাধারণ ও কষ্টদায়ক সমস্যা। এর প্রধান কারণ হলো শিশুকে সঠিক নিয়মে দুধ না খাওয়ানো (Improper Latch)। এমন হলে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর পর কিছুটা মাতৃদুগ্ধ বোঁটার চারপাশে আলতো করে লাগিয়ে রাখলে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষত শুকায়। পাশাপাশি ক্ষতের ধরণ অনুযায়ী দ্রুত হোমিও ঔষধ সেবন করা উচিত।