প্রসবের ফুল না পড়া বা রিটেইন্ড প্লাসেন্টা (Retained Placenta) বলতে বোঝায় শিশু জন্মের পর সাধারণত ৩০ মিনিটের মধ্যে গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা প্রাকৃতিকভাবে জরায়ু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাইরে বের না হওয়া। স্বাভাবিক প্রসব প্রক্রিয়ায় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জরায়ু পুনরায় সংকুচিত হয়ে ফুলটিকে বাইরে ঠেলে দেয়। কিন্তু অনেক সময় জরায়ুর পেশির তীব্র দুর্বলতা বা সংকোচন ক্ষমতার অভাব (Uterine Atony), জরায়ুর মুখের অকাল সংকোচন (Adherent Placenta) অথবা জরায়ুর ভেতরের কোনো ক্ষতের সাথে ফুলটি শক্তভাবে আটকে থাকার কারণে এটি ভেতরেই রয়ে যায়। যদি গর্ভফুলটি সম্পূর্ণ বা এর আংশিক অংশও জরায়ুর ভেতরে আটকে থাকে, তবে তা নতুন মায়ের জন্য মারাত্মক জীবননাশী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর ফলে প্রসবোত্তর তীব্র রক্তক্ষরণ (Postpartum Hemorrhage - PPH), জরায়ুতে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা ইনফেকশন এবং তীব্র প্রসবোত্তর জ্বর দেখা দিতে পারে। প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনেক সময় হাত দিয়ে (Manual Removal) বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এটি বের করা হয়, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।প্রসবের পর গর্ভফুল আটকে যাওয়ার এই জটিল ও জরুরি অবস্থায় হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত মৃদু, প্রাকৃতিকভাবে কার্যকরী এবং নিরাপদ একটি বিকল্প পথ প্রদর্শন করে।
প্রসবের পর ফুল আটকে গেলে বা এর অংশবিশেষ ভেতরে রয়ে গেলে চিকিৎসকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ব্যবহৃত প্রধান কিছু ঔষধ:
| ঔষধের নাম | ব্যবহারের লক্ষণ |
| Secale Cornutum | জরায়ুর চরম শিথিলতা বা পেশির নিষ্ক্রিয়তার কারণে যদি ফুল না পড়ে। জরায়ুর মুখ খোলা থাকা সত্ত্বেও কোনো সংকোচন বা ব্যথা থাকে না এবং কালচে, তরল রক্তক্ষরণ হতে থাকে। |
| Sabina | জরায়ুর তীব্র ও অনিয়মিত সংকোচনের কারণে যদি ফুল আটকে থাকে এবং তার সাথে চাকা চাকা (Clots) উজ্জ্বল লাল রঙের প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, যা কোমর থেকে তলপেট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। |
| Pulsatilla Nigricans | প্রসবের পর যদি প্রসব বেদনা বা জরায়ুর সংকোচন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার কারণে ফুল পড়ছে না। গর্ভবতী নারী যদি অত্যন্ত কান্নাকাটি করেন এবং খোলা বাতাস পছন্দ করেন। |
| Cantharis Vesicatoria | ফুল আটকে থাকার পাশাপাশি যদি প্রস্রাবের রাস্তায় তীব্র জ্বালাপোড়া ও বারবার প্রস্রাবের বেগ হয় এবং জরায়ু অঞ্চলে প্রচণ্ড গরম বা প্রদাহ অনুভূত হয়। |
| Hydrastis Canadensis | প্রসবের পর যদি গর্ভফুলের ছোট কোনো অংশ (Placental fragments) ভেতরে রয়ে যাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে হালকা ক্ষরণ বা ইনফেকশন হতে থাকে। |
**প্রসবের পরে ফুল (Placenta) না পড়লে
ইহাতে ক্যান্থারিস ৩০, সিপিয়াম Q. পালস ৩০/২০০, সেবাইনা ৩০, সিকেলি তন্ত্র, ৩০/২০০, সিপিয়া ৩০ যে কোন একটি ১৫/২০ ফোঁটা মাত্রায় ৩/৪ ঘন্টাস্তর ব্যবহার্য। **প্রসবের এক/দেড় ঘন্টার মধ্যে ফুল না পড়লে ঔষধ ব্যবহার করবেন।
সুতিকা জ্বর (Puerperal Fever)- কষ্টসহ বিলম্বে প্রসবের ফলে পেরিটোনিয়ামে চাপ লাগার দরুন অথবা ঠিক সময়ে ফুল না পড়ে পচন আরম্ভ হলে প্রসুতির রক্ত বিষাক্ত হয়ে সুতিকা জ্বর দেখা দেয়। সন্তান জন্মানোর ৩ দিন পর ইহা দেখা দিয়া থাকে। প্রসবাস্তে রক্তের বিকৃত অবস্থা আঁচ করতে পারলেই ইচিনেসিয়া ( ৪/৫ ফোঁটা মাত্রায় দিনে ৪ বার ব্যবহার এই রোগ ভাল হয়ে যায়, স্রাবে দুর্গন্ধ থাকলে পাইরোজেন ব্যবহার্য। ডাঃ বোরিক বলেছেন প্রসবাস্তে পাইরোজেন হোমিওপ্যাথিক মতে শক্তিব্যঞ্জক পচন নিবারক একটি মহামূল্যবান ঔষধ বলে প্রতিষ্ঠা করেছে। মোট কথা, প্রসবের পর ঠিক সময় মত পাইরোজেন অথবা ইচিনেসিয়া প্রয়োগ করতে পারলে সুতিকা জ্বর প্রতিরোধ করা যায়।
** প্রসবের পর দুর্বলতা রোধ করে প্রসুতির স্বাস্থ্য ঠিক করতে এভেনা স্যাটাইভা Q. ১০ ফোঁটা দিনে ২ বার, সাথে কেলিফস ৬x চার বড়ি সকাল সন্ধ্যায় সেবনীয় ।
দক্ষ পর্যবেক্ষণ: সন্তান প্রসবের পর ফুল পড়েছে কিনা তা অভিজ্ঞ ধাত্রী বা চিকিৎসকের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। ফুলের সামান্য অংশও ভেতরে থাকা বিপজ্জনক।
অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা: এটি একটি জরুরি চিকিৎসাগত অবস্থা (Medical Emergency)। তাই হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবনের পাশাপাশি রোগীর রক্তচাপ, পালস এবং রক্তক্ষরণের পরিমাণের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ: ফুল পড়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে রোগীকে দ্রুত তরল খাবার, স্যালাইন বা প্রয়োজনে রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে।
সাধারণত শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রাকৃতিকভাবেই জরায়ুর সংকোচন ঘটে এবং ৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা শরীর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। যদি সন্তান প্রসবের ৩০ মিনিট পরও ফুল না পড়ে, তবে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'রিটেইন্ড প্লাসেন্টা' (Retained Placenta) বা ফুল আটকে যাওয়া বলা হয়।
এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি অবস্থা (Medical Emergency)। ফুল না পড়লে বা এর সামান্য অংশও জরায়ুর ভেতরে রয়ে গেলে প্রসবোত্তর তীব্র রক্তক্ষরণ (PPH), জরায়ুতে মারাত্মক ইনফেকশন, প্রচণ্ড জ্বর এবং শরীর বিষাক্ত হয়ে (Sepsis) মায়ের জীবনহানির ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হতে পারে।
হোমিয়োপ্যাথিতে হাত দিয়ে টেনে বা যান্ত্রিক কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই আটকে থাকা ফুল বের করা সম্ভব। হোমিওপ্যাথিক ঔষধ জরায়ুর অলস পেশিগুলোকে উদ্দীপিত করে প্রাকৃতিকভাবে তীব্র ও নিয়মতান্ত্রিক সংকোচন (Contractions) তৈরি করে। এর ফলে জরায়ুর মুখ শিথিল হয় এবং আটকে থাকা ফুলটি কোনো রকম ক্ষত ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে আলগা হয়ে বাইরে চলে আসে।
মোট 10টি ওষুধ
এই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও রোগ সম্পর্কে জানুন
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত
যোগাযোগ করুন