গণোরিয়ার প্রভাব
All ৪৬ ভিউ

গণোরিয়ার প্রভাব

রোগ সম্পর্কে

গণোরিয়ার প্রভাব ও জটিলতা (Impact and Complications of Gonorrhea) মানবদেহের প্রজননতন্ত্র এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। 'নিসেরিয়া গণোরিয়া' ব্যাকটেরিয়াজনিত এই যৌনবাহিত রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় কেবল প্রস্রাবের নালী বা যোনিপথের অস্বস্তির সৃষ্টি করলেও, উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে এটি শরীরের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক ক্রনিক রূপ ধারণ করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে গণোরিয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে মূত্রনালী সরু হয়ে যাওয়া (Stricture Urethra), প্রস্টেট গ্রন্থির দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (Prostatitis) এবং এপিডাইডাইমিস নামক শুক্রাণু বহনকারী নালীর সংক্রমণের কারণে স্থায়ী বন্ধ্যাত্ব (Male Infertility) দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগের প্রভাব আরও বেশি ভয়াবহ। লক্ষণহীন গণোরিয়ার কারণে ব্যাকটেরিয়া জরায়ু এবং ডিম্বনালীতে ছড়িয়ে পড়ে 'পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ' (PID) সৃষ্টি করে। এর ফলে ফেলোপিয়ান টিউব বা ডিম্বনালী স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা নারীদের বন্ধ্যাত্ব (Female Infertility) এবং জরায়ুর বাইরে বিপজ্জনক গর্ভধারণ বা একটোপিক প্রেগনেন্সির (Ectopic Pregnancy) ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া রক্তস্রোতের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লে তাকে 'ডিসেমিনেটেড গণোকোক্কাল ইনফেকশন' (DGI) বলা হয়, যার প্রভাবে তীব্র বাতের ব্যথা (Gonorrheal Arthritis), ত্বকে ঘা বা র‍্যাশ এবং হৃৎপিণ্ডের ভাল্বের ক্ষতি হতে পারে।গণোরিয়ার এই সমস্ত মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদী কুপ্রভাব দূর করতে হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত গভীরক্রিয় এবং সামগ্রিক (Holistic) একটি চিকিৎসাপদ্ধতি।হোমিওপ্যাথিক ঔষধ শরীরের অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা জীবনীশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করে, ফলে জরায়ু বা মূত্রনালীর ভেতরের ক্ষত প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে যায়, ক্ষতিকারক প্রভাবগুলো শরীর থেকে নিষ্কাশিত হয় এবং রোগী জটিল কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই স্থায়ীভাবে আরোগ্য লাভ করেন।

বিস্তারিত চিকিৎসা পদ্ধতি

কুপ্রভাব ও জটিলতা অনুযায়ী প্রধান হোমিওপ্যাথিক ঔষধ (Treatment Overview)

গণোরিয়ার তীব্র ক্ষরণ পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতা ও কুপ্রভাব দূর করতে ব্যবহৃত প্রধান কিছু ঔষধ:

ঔষধের নাম ব্যবহারের লক্ষণ
Medorrhinum গণোরিয়ার কুপ্রভাব দূর করার জন্য এটি একটি অন্যতম প্রধান নোসোড (Nosode) ঔষধ। গণোরিয়া চাপা পড়ার পর যদি শরীরে বাতের ব্যথা, প্রচণ্ড শীতকাতরতা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং রাতে মানসিক অস্থিরতা বাড়ে।
Thuja Occidentalis ভুল বা কড়া চিকিৎসায় গণোরিয়ার পুঁজ পড়া বন্ধ হওয়ার পর যদি শরীরে আঁচিল (Warts), ডুমুরের মতো মাংসপিণ্ড গজায়, মূত্রনালী সরু হয়ে আসে অথবা গেঁটে বাত দেখা দেয়।
Clematis Erecta গণোরিয়ার প্রভাবে যদি পুরুষদের অণ্ডকোষ এবং এপিডাইডাইমিস গ্রন্থি শক্ত হয়ে ফুলে যায়, প্রস্রাবের বেগ অত্যন্ত ধীর বা ফোঁটায় ফোঁটায় হয় এবং মূত্রনালীতে সংকোচন অনুভব হয়।
Sarsaparilla গণোরিয়ার পর যদি মূত্রথলিতে পাথর জমার প্রবণতা তৈরি হয়, প্রস্রাবের শেষ ফোঁটায় তীব্র এবং অসহনীয় শূলানি ব্যথা হয় এবং সাদাটে তলানি পড়ে।
Rhododendron গণোরিয়াজনিত বাতের ব্যথার (Gonorrheal Rheumatism) ক্ষেত্রে একটি সেরা ঔষধ। ঝড়ের আগে বা বর্ষাকালে আক্রান্ত সন্ধি বা জয়েন্টের ব্যথা ও ফোলা ভাব তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেলে এটি কার্যকর।

পিতামাতার গণোরিয়া হইয়া থাকিলে তাহাদের ঔরষজাত সন্তানের যে কোন রোগে মেডোরিনাম উচ্চশক্তি প্রয়োগে নির্মূল আরোগ্য হয়। Dr. B. Jones-এর মতে শরীর হইতে গনোরিয়ার বীজ, সম্পূর্ণরূপে দূর করার জন্য Thuja ৩০ সপ্তাহে ১ বার রাত্রে ঘুমানোর পূর্বে সেবন করা ভাল। স্বামী হতে গণোরিয়া প্রাপ্ত রোগীনীকেThuja প্রয়োগ করবে। Thuja বিফলে মেডোরিনাম ব্যবহার করবে।

জটিলতা এড়াতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ঘরোয়া যত্ন

  • দ্রুত স্ক্রীনিং ও পরীক্ষা: গর্ভাবস্থায় বা প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সামান্যতম সন্দেহ হলে ইউরিন কালচার (Urine Culture) বা সোয়াব টেস্টের (Swab Test) মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত হয়ে শুরুতেই চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

  • অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমাতে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফলমূল, সবুজ শাকসবজি এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত।

  • ব্যক্তিগত সচেতনতা: সম্পূর্ণ নিরাময় নিশ্চিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো ধরণের শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সংক্রমিত কাপড়ের মাধ্যমে যেন পরিবারের অন্য কেউ আক্রান্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রোগ সম্পর্কিত প্রশ্ন

গণোরিয়া রোগটি সময়মতো চিকিৎসা না করালে কী কী ক্ষতি হতে পারে?

গণোরিয়া বা প্রমেহ রোগ অবহেলা করলে এটি শরীরের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক ক্রনিক রূপ ধারণ করে। এর ফলে পুরুষদের মূত্রনালী সরু হয়ে যাওয়া, অণ্ডকোষের প্রদাহ এবং নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ু ও ডিম্বনালীর স্থায়ী ক্ষতিসহ নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট বা বন্ধ্যাত্ব (Infertility) দেখা দিতে পারে।

গণোরিয়ার কারণে কীভাবে বন্ধ্যাত্ব (Infertility) ঘটে?

পুরুষদের ক্ষেত্রে: ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ শুক্রাণু বহনকারী নালী বা এপিডাইডাইমিসে ছড়িয়ে পড়লে নালীটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা শুক্রাণু নিঃসরণে বাধা দেয়। নারীদের ক্ষেত্রে: এই ব্যাকটেরিয়া জরায়ু ও ফেলোপিয়ান টিউবে ছড়িয়ে পড়ে 'পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ' (PID) সৃষ্টি করে। এর ফলে ডিম্বনালী ব্লক হয়ে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে বাধা সৃষ্টি হয়, যা স্থায়ী বন্ধ্যাত্বের কারণ।

৪. গণোরিয়া রোগটি জোরপূর্বক চেপে দিলে (Suppressed Gonorrhea) হোমিওপ্যাথিতে কী সমাধান আছে?

প্রচলিত কড়া ঔষধ বা বাহ্যিক ইনজেকশন দিয়ে ক্ষরণ বা পুঁজ পড়া বন্ধ করলে রোগটি ভেতরে চেপে গিয়ে নানাবিধ ক্রনিক জটিলতা তৈরি করে। হোমিয়োপ্যাথিতে Medorrhinum এবং Thuja Occidentalis-এর মতো গভীরক্রিয় নোসোড ও এন্টি-সাইকোটিক ঔষধের মাধ্যমে এই চাপা পড়া রোগের বিষ বা মায়াজম শরীর থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কাশন করে স্থায়ী আরোগ্য দেওয়া হয়।

হোসনেআরা হিমু

হোমিও বিশেষজ্ঞ

ডা. হোসনে আরা একজন অভিজ্ঞ ও সেবাপরায়ণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। তিনি...

শেয়ার করুন

সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রোগ

এই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও রোগ সম্পর্কে জানুন

আপনার কি আমাদের সাহায্য প্রয়োজন ?

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত

যোগাযোগ করুন